সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক উঠতে যাবে কেন?

সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক উঠতে যাবে কেন?https://www.facebook.com/kajalkanti.karmakar/videos/1887329511314564/?t=2

•নিজেদের সম্বন্ধে লিখতে ইচ্ছে করছিল না, তবুও ঘাটাল মহকুমায় কয়েক জন সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে সারা মহকুমা জুড়ে বিতর্ক  ওঠায় এই প্রতিবেদনটি লেখার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলাম।
প্রথমেই বলি, সাংবাদিকতা হল, বিভিন্ন ঘটনাবলী, বিষয়, ধারণা  ও মানুষ সম্পর্কিত প্রতিবেদন তৈরি ও পরিবেশন, যা  সমাজে প্রভাব বিস্তার করে।  মুদ্রিত, টেলিভিশন, বেতার, ইন্টারনেট, এবং পূর্বে ব্যবহৃত নিউজরিল সংবাদ মাধ্যমের অন্তর্গত। কিন্তু কোনও পরিস্থিতিতেই সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সাংবাদিক তাঁর নিজের মতামত, ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে সংবাদ এবং সংবাদ পাঠককে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে না—এটাও সাংবাদিকতার নিয়মের মধ্যেই রয়েছে।
যেহেতু সাংবাদিকরাও মানুষ। তাই তাঁদের নিজস্ব কিছু স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য থাকবে।  এক সাংবাদিকদের
সঙ্গে অন্য এক সাংবাদিকের  প্রকৃতিগত পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। কেউ নিরামিষ খেতে পারেন, কেউ আমিষের ওপর নির্ভর করেন। কেউ নিয়মিত মদ্য পান করতে পারেন, কোনও সাংবাদিক হয়তো মদ-ই  স্পর্শ করে দেখেননি।  কোনও সাংবাদিক নাস্তিক হতে পারেন, কেউ আবার ধর্মপ্রাণ হতে পারেন। কিন্তু সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সজাগ থাকতে হবে তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছেটা যেন সংবাদের ওপর প্রতিফলিত না-হয়।  তিনি যখন সাংবাদিকতার ময়দানে থাকবেন  তখন যেন তাঁর ব্যক্তিগত কু-আচরণগুলি প্রকাশ না পায়। 
কয়েক জন বিধায়ক, জেলা পরিষদের সদস্য, শাসক দলের কিছু নেতাকে নিয়মিত  দেখা যায় চুপি সারে পকেট থেকে টাকা বার করে নির্দিষ্ট কয়েক জন সাংবাদিককে দিতে।  ‘রতনে রতন চেনে’, আসলে ওই সমস্ত নেতাগুলি ব্যক্তিগতভাবে অস্বচ্ছ বলেই তাঁরাও দুনীর্তিগ্রস্থ সাংবাদিকদের অতি সহজেই চিনে নিতে পারেন।বিজেপির কিছু নেতা সম্প্রতি ওই একই কালচার শুরু করছেন।সত্যি কথা বলতে কী, সিপিএমের আমলে বামপন্থী নেতাদের   সাংবাদিকদের বিষয়ে ওই কালচার ছিল না। 
কিন্তু ঘাটাল মহকুমায় কয়েক জন সাংবাদিক রয়েছেন, যাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত ইচ্ছেকে চরিতার্থ করার জন্য এই পেশাকে বেছে নিয়েছেন। কেউ ভেবেছেন, তাঁর যার-যার  ওপর রাগ বা ক্ষোভ রয়েছে সেই রাগ-ক্ষোভগুলির প্রকাশ করার জন্য তিনি সংবাদপত্রে লেখা-লেখি করবেন। কেউ ব্রত নিয়েছেন, তিনি সমস্ত  নেতা-মন্ত্রী-আমলাদের তেল দিয়ে চলবেন। কোনও বিতর্কিত খবর করবেন না। কারণ তিনি জানেন, এই নীতি অবলম্বন করে চললে তাঁর ভাগ্যে জুটতে পারে মঞ্চের চেয়ার, বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ, বিভিন্ন সাহিত্য সংস্থা থেকে সারা বছরে দু-দশটা করে পুরস্কার। কেউ আবার সাংবাদিক বা সম্পাদক শব্দটাকে নামের পাশে সর্বক্ষণ ব্যবহার করার জন্য এই পেশায় একবার নাম লিখিয়ে ছিলেন। সুপারিশ করে ‘প্রেস ক্লাব’-এ নামও নথিভুক্ত করেছেন। কিন্তু তিনি হয়তো বিগত দেড়-দু দশকে কোনও সংবাদই লিখেননি। কোনও  সম্পাদকের  তাঁর নিজের সম্পাদিত সংবাদপত্রের ১ জানুয়ারির সংখ্যা পরের ১ অক্টোবরে প্রকাশিত হয়। কারোর আবার তাও হয় না। কিন্তু  কথায় কথায় তাঁরা নিজেকে সাংবাদিক বা সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিয়ে সমাজে গুরুত্ব পাওয়ার এবং সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করেন। 
...উপরের পঙক্তির লেখাটি তবুও মেনে নেওয়া যায়। সে অর্থে অতটা বিপজ্জনক নয়। কিন্তু সাংবাদিকতা করতে গিয়ে টাকা চাওয়া কিম্বা টাকার জন্য ব্ল্যাকমেল করা এটা কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটা ভদ্রস্থ তোলাবাজি ছাড়া আর কিছুই না। 
মিডিয়াকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই টাকার প্রয়োজন। আর তার জন্যই রয়েছে বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা। বিজ্ঞাপন থেকেই মিডিয়ার সমস্ত খরচ উঠে আসে। সংবাদপত্রে বা টিভিতে বিজ্ঞাপন না থাকলে আমরা  সংবাদপত্র পড়া বা টিভি দেখারই সুযোগ পেতাম না। এত খরচ পড়ত তা আমাদের নাগালে বাইরে চলে যেত। তখন একটি সংবাদপত্র ৩০ টাকারও বেশি দাম দিয়ে কিনতে হত। বাড়িতে টিভির চ্যানেল দেখারও সুযোগ পেতাম না।
রাজ্যস্তরের প্রথম শ্রেণীর দৈনিক সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেলগুলি সম্মানজনক মাসিক সাম্মানিক দিয়ে সাংবাদিকদের কাজ করায়। গাড়ি ভাড়া, ফোন খরচ সবই দিয়ে দেয়। ওই সমস্ত সংবাদপত্র এবং টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকদের মূল পেশাই হল সাংবাদিকতা। তাঁরা দিনের প্রায় ১২ঘন্টাই সাংবাদিকতার কাজে ব্যস্ত থাকেন। 
কিন্তু ঘাটাল মহকুমার মতো এলাকার তথা ছোট পরিধির সাপ্তাহিক এবং পাক্ষিক সংবাদপত্রগুলি অনেকটাই সম্পাদক বা প্রকাশকের পকেটের টাকার ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের টাকা  থেকেই চলে। কারণ এই সমস্ত পাক্ষিক বা সাপ্তাহিক কাগজে সে অর্থে বিজ্ঞাপনও আসে না আর বিক্রিও হয় না। যাঁরা পাক্ষিক বা সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা করেন তাঁরা সাধারণত অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। মূলত সংবাদ লেখার নেশাতেই পাক্ষিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। প্রাপ্তি বলতে শুধু সম্মান। ওই সমস্ত কিছু জেনেই (মানে   পাক্ষিক ও সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে কোনও পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না জেনেই) তাঁরা পাক্ষিক ও সাপ্তাহিক সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত হন।  িকন্তু তার মানে এই নয়, খবর করতে গিয়ে কারোর কাছ থেকে টাকা তোলার নিয়ম রয়েছে বা তাঁরা টাকা তুলতে পারেন। ওটা পুরোপুরি সাংবাদিকতার নিয়ম বিরুদ্ধ।
বেশ কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, ঘাটাল মহকুমায় কয়েকজন সাংবাদিক রয়েছেন যাঁরা খবর করতে গেলেই টাকার দাবি করেন। তা না হলে ব্ল্যাক মেল করার হুমকি দেন। রেশন ডিলার, মদ দোকান, ইট ভাটা, বালি খাদানের মতো জায়গাগুলি থেকে  মাসোহারা তুলেন। দুর্গা পুজো বা ক্লাবের খবর করতে গেলেও টাকা নিতে ছাড়েন না। কর্তৃপক্ষ টাকা  দিতে রাজি না হলে বাইকের তেল খরচের জন্য ন্যূনতম ৫০-১০০টাকা নিতেও ছাড়েন না। এখন প্রশ্ন, একজন সাংবাদিক তাঁর মিডিয়ার জন্য খবর তুলতে গেছেন। সেটা সংশ্লিষ্ট মিডিয়ার ইন্টারেস্ট। সে ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের টাকা দিতে হবে কেন? রেশন ডিলার, মদ দোকান, ইট ভাটা, বালি খাদান যদি অন্যায় কাজ করে সেটাকে চাপা দেওয়ার জন্য টাকা নিয়ে সাংবাদিকতার পেশাকে কলুষিত করতে হবে কেন?
তবে আমাদের ঘাটাল মহকুমার বেশ কিছু দক্ষিণপন্থী নেতাদের জানি তাঁরা সাংবাদিকদের খুশি করার জন্য নিয়মিত টাকা দেন। জনসভা হলে সাংবাদিকদের গাড়ি ভাড়ার টাকা পকেটে  গুঁজে দেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে কয়েক জন সাংবাদিক আগে থেকে সংশ্লিষ্ট নেতাকে বলে দেন, ‘আগামী কাল যাচ্ছি। গাড়ি ভাড়া ও খাওয়ার খরচ প্যাকেট করে রাখতে হবে।’   
কয়েকজন বিধায়ক, জেলা পরিষদের সদস্য, শাসক দলের কিছু নেতাকে নিয়মিত দেখা যায়  চুপিসারে তাঁদের পকেট থেকে টাকা বার করে নির্দিষ্ট কয়েকজন সাংবাদিকদের   দিতে (সব সাংবাদিকদের নয় কিন্তু, নির্দিষ্ট কয়েক জন সাংবাদিককে নিয়মিত টাকা দেন। গাড়ির তেল খরচ বা হোটেল খরচ হিসেবে ৫০০-১০০০ টাকা করে দেন)।  ‘রতনে রতন চেনে’, আসলে ওই সমস্ত নেতাগুলি ব্যক্তিগতভাবে অস্বচ্ছ বলেই তাঁরাও দুনীর্তিগ্রস্থ সাংবাদিকদের অতি সহজেই চিনে নিতে পারেন। যাঁদের অন্যতম কাজ সাংবাদিকদের খুশি করে নিজের বশে রাখা। আরও মোদ্দা কথায় বললে দাঁড়ায়, তাঁরা সাংবাদিককে কিনে রাখার প্রচেষ্টায় থাকেন। বিজেপিও এই একই কালচার শুরু করছে। এরা কেন টাকা দেন বুঝতে পারি না। সত্যি কথা বলতে কী, সিপিএমের আমলে অন্যান্য দুনীর্তি থাকলেও বামপন্থী নেতাদের   সাংবাদিক সম্পর্কিত ওই কালচার ছিল না।   
সব চাইতে অবাক লাগে, সাংবাদিক হিসেবে খবর করতে গিয়ে টিফিনের দিকে হাঁ-করে তাকিয়ে থাকেন। টিফিন দিতে দেরী হলে উদ্যোক্তাদের বার বার মনে করিয়ে দেন। কী উপহার আছে বার বার খোঁজ নেন। দৈনিক সংবাদপত্র এবং টিভির সাংবাদিকদের   তাড়া থাকে বলে মূল অনুষ্ঠানের পরেই অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।  কোনও কোনও সাংবাদিক ওই সমস্ত চলে যাওয়া সাংবাদিকদের টিফিন ও উপহারগুলিও উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে চেয়ে  নিয়ে গিয়ে হাসি মুখে বউয়ের হাতে তুলে দেন। বলেন, ‘দেখ, আমাকে ভালোবেসে কতো কিছু দিয়েছে’। বউয়েরও গদ-গদ হাসি...। বেচারা বউও বুঝতে পারে না কী ভিক্ষাবৃত্তি করে ওই সমস্ত টিফিনগুলি বাড়িতে আনা হয়েছে!

—সবিনয় আবেদন—

সংবাদ করার জন্য কোনও সাংবাদিককে কোনও ভাবে টাকা দিতে হয় না। তাই গাড়ি ভাড়া, পেট্রল, ফোন খরচ বা খবর করার জন্যও কোনও টাকা দেবেন না। https://www.facebook.com/kajalkanti.karmakar/videos/1887329511314564/?t=2
সাংবাদিকরা কোনও হুমকি দিতে পারেন না। কোনও ভাবে হুমকি দিলে প্রয়োজনে পুলিসকে জানান।
প্রত্যেকটি সংবাদপত্র/টিভির নিজস্ব প্রতিনিধি থাকে। কোনও দালাল ছেড়ে দেওয়া থাকে না। দালালের মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় না।
যে মিডিয়াকে পছন্দ আপনারা সরাসরি সেই মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। সেই মিডিয়ার প্রতিনিধির সঙ্গে সরাসরি দেখা করে খবর, তথ্য বা আমন্ত্রণ পত্র দিন।  
প্রেস ক্লাবের নামে কোনও চিঠি ইস্যু করলে  দৈনিক সংবাদপত্র/টিভির বা কোনও জনপ্রিয় পাক্ষিক সংবাদপত্রের সাংবাদিক সেই অনুষ্ঠানে নাও যেতে পারেন। তাই প্রত্যেক মিডিয়ার সাংবাদিককে আলাদা আলাদা করে আমন্ত্রণ জানাবেন।
দরকার হলে ফোনে সরাসরি যোগাযোগ করুন। সাংবাদিকদের অনুমতি ব্যতীত হোয়াটসঅ্যাপে কোনও আমন্ত্রণ পাঠাবেন না।
➥😊কিছু সাংবাদিক রয়েছেন যাঁরা মঞ্চের ওপরের চেয়ারে বসার  জন্য উদ্যোক্তাদের নানা ভাবে প্রভাবিত করেন। অতিথিদের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরঘুর করে মনীষীদের/শহিদবেদীতে মাল্যদান করার জন্য  সুযোগ খোঁজেন। জেনে রাখুন, পূর্ব নির্দিষ্ট বক্তা হিসেবে কোনও সাংবাদিককে আমন্ত্রণ না জানানো হলে সাংবাদিকদের অযথা মঞ্চে তুলে অভ্যর্থনা করার বা অতিথিদের সঙ্গে মাল্যদান করার সুযোগ দেওয়ার কোনও প্রয়োজনই নেই। 
💬কাজলকান্তি কর্মকার || রারাজ্যের প্রথম শ্রেণীর একটি বাংলা দৈনিক সংবাদপত্রের সাংবাদিক
ঘাটাল || পশ্চিম মেদিনীপুর
M&W: 9933066200
eMail: ghatal1947@gmail.com

0/Post a Comment/Comments

Previous Post Next Post
close