মঞ্চে এক ঘেঁয়েমি বক্তব্য...


এক ঘেঁয়েমি বক্তব্য...কারোর কি ভালোলাগে?
ফোর-জির যুগে অনেক কিছু বদলে গেলেও ঘাটাল মহকুমা (রাজ্যের অন্যান্য জায়গাতেও) অনুষ্ঠান মঞ্চে উঠে বক্তব্য বলার ধরন এখনও বদলায়নি। মঞ্চে বক্তব্যের ধরনটা সেকেলেই রয়ে  গিয়েছে। কারণ, মোড়ল-রাজ আমলে মঞ্চে উঠে যাঁরা বক্তব্য পেশ করতেন তখন তাঁদের পার্শ্ববর্তী অতিথিদের নাম উল্লেখ করে যথাযথ সম্মান জানাতে হত। আর তা না হলে বক্তৃতা চলাকালীনই জুটত তির্যক ভর্ৎসনা। এখনও সেই নিয়ম থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে অন্যান্য অতিথিরা। মঞ্চে মাইক নিয়ে একে একে মঞ্চে চেয়ার দখলকারীদের বন্দনা শুরু হয়। অনেক সময় জানাতে শুরু করেন তখন দর্শকদের মানসিক অবস্থাটা যে কী হয় তা একবারও ভেবে দেখার প্রয়োজন মনে করেন না তাঁরা। তারপর নিজেদের পরস্পরকে বন্দনা করার পর যে ধরনের বক্তব্য (পাঁচন) উদগার করেন সেগুলো কেমন করে দর্শকরা গ্রহণ করেন সে বিষয়েও খেয়াল থাকে না। বক্তারা মনে করেন, তাঁদের বক্তব্যই দর্শকরা হাঁ করে গিলছেন। সঞ্চালক টাইম ম্যানেজমেন্ট করতে গিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখার কথা (যার ভাবার্থ করলে দাঁড়ায়, আপনি না বক্তব্য রাখলেও চলবে) বললেও বক্তার বলার হুঁশ থাকে না।   প্রশ্ন, আরও কতদিন আমাদের অন্তঃসারশূন্য বক্তব্য হজম করতে হবে? কবে ওই অতিথিরা দর্শকদের অন্তর্যামী হয়ে মেদহীন বক্তব্য দিতে শিখবেন? যাঁরা নিয়মিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন দেখেছি তাঁরাই মঞ্চে একবর মাইক্রোফোন হাতে পেলে ছাড়তে চান না।  মঞ্চের নিচ থেকে তাঁদের কে যে কাঁচা কাঁচা খিস্তি দেওয়া হয় সেটা তাঁরা না বোঝারই চেষ্টা করেন।
এক একটি মঞ্চে ২৫-৩০ জন করেও অতিথি থাকেন। সেক্ষেত্রে এক-এক জন অতিথি যখন মাইক্রোফোন নিয়ে তিনি বাদে বাকী সকল অতিথির নাম ধরে  ‘সম্মান’ জানাতে শুরু করেন তখন দর্শকদের মানসিক অবস্থাটা যে কী হয় তা একবারও ভেবে দেখার প্রয়োজন মনে করেন না তাঁরা। তারপর নিজেদের পরস্পরকে বন্দনা করার পর যে ধরনের বক্তব্য (পাঁচন) উদগার করেন সেগুলো কেমন করে দর্শকরা গ্রহণ করেন সে বিষয়েও খেয়াল থাকে না। বক্তারা মনে করেন, তাঁদের বক্তব্যই দর্শকরা হাঁ করে গিলছেন। সঞ্চালক টাইম ম্যানেজমেন্ট করতে গিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখার কথা (যার ভাবার্থ করলে দাঁড়ায়, আপনি না বক্তব্য রাখলেও চলবে) বললেও বক্তার বলার হুঁশ থাকে না। তিনি মনে করেন, তাঁর বক্তব্য শোনার জন্যই বোধহয় এত ভিড়, তাই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য কী করে বলব? প্রশ্ন, আরও কতদিন আমাদের অন্তঃসারশূন্য বক্তব্য হজম করতে হবে? কবে ওই অতিথিরা দর্শকদের অন্তর্যামী হয়ে মেদহীন বক্তব্য দিতে শিখবেন?

আমার পরামর্শ, মঞ্চ থেকে এমন বক্তব্য দেবেন না যা দর্শক বা শ্রোতাদের অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে। মনে রাখবেন, দশর্ক বা শ্রোতারা আপনার বক্তব্য শোনার জন্য অনুষ্ঠানে যাননি। তাঁদের মনযোগ থাকে মূল অনুষ্ঠানের দিকে। আপনি এমন কোনও অভিজ্ঞতার কিম্বা নতুন  কথা যদি বলতে না পারেন তাহলে আপনার মামুলি এবং গতানুগতিক বক্তব্য শুনতে গিয়ে শ্রোতারা মনে মনে আপনাকে যে গালিগালজ করবে সেটা খেয়াল রাখা দরকার। রাজনৈতিক মঞ্চ বাদে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য কখনই ২-৩ মিনিটের বেশি হওয়া উচিত নয়।

একই দোষে দুষ্ট সঞ্চালকেরাও। তাঁরাও মঞ্চে বাড়তি কথা বলেন যা বিরক্তেরই কারণ হয়। সঞ্চালকরা ভাবেন, তাঁদের কবিতা, সাহিত্য শোনার জন্যই বোধহয় এত ভিড়...। এক একটি অনুষ্ঠানের মোট সময়ের ২০-২৫ শতাংশ সময় অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে সঞ্চালকরাই নিয়ে নেন। বক্তা এবং সঞ্চালক উভয়েরই দর্শক বা শ্রোতাদের পালসটা বোঝা উচিত। মঞ্চে বলার সুযোগ পাওয়ার পরই এরা সব কিছু ভুলে যায় কেন বুঝতে পারি না। সত্যি বলছি খুব কষ্ট হয়।
আমি দূরদর্শনের এক সংবাদ পাঠিকার সঞ্চালনা দেখেছিলাম, কলকাতার এক বড় অনুষ্ঠানে। এক একটি অনুষ্ঠান বা বক্তার বক্তব্যের মাঝে ২০-৩০টির বেশি শব্দই ব্যবহার করেননি তিনি। আর এখানে হলে? এখানের বেশ কিছু সঞ্চালক রয়েছেন যাঁরা নিজের যে কতটা জ্ঞান রয়েছে সেটা যতক্ষণ না তিনি দর্শকদের জানাতে পারেন তিনি পরের অনুষ্ঠান শুরুই করতে দেবেন না। কবিতা/গান/বাণীর লাইন শুনিয়ে শুনিয়ে শ্রোতাদের বোর করে দেবেন😊। সেই সঙ্গে ঘাটাল মহকুমার বেশিরভাগ সঞ্চলক  অতিথিদের এমন নগ্নভাবে কৃত্রিম প্রশংসা করেন যেটা অতিথিদের চামড়া পাতলা হলে তাঁদের গায়ে লাগার কথা।
এটা শুধু আমার অভিজ্ঞতা নয়। সাংবাদিক হিসেবে সাধারণত মঞ্চের নিচে প্রথমের দিকে সারিতে আমাদের বসতে হয়। টানা বক্তব্য রাখার সময় শ্রোতাদের আসন থেকে বক্তাদের উদ্দেশ্যে খিস্তিও দিতে শোনা যায়।
তাহলে  শ্রোতাদের  কি সত্যিই ধৈর্য নেই দীর্ঘ্য বক্তব্য শোনার? অবশ্যই রয়েছে। বক্তব্যের মধ্যে যদি তেমন আকর্ষণ থাকে তাহলে সেই বক্তব্য যতই বড় হোক শ্রোতাদের ধৈর্যচ্যুতি হয় না। আমি শংকর, সব্যসাচী চক্রবর্তী, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের মতো অনেকের বক্তব্য শুনেছি যাদের বক্তব্য শোনার সময় শ্রোতারা মনে মনে আশঙ্কায় থাকেন। তাঁরা ভাবতে থাকেন, এই বোধহয় বক্তব্য শেষ হয়ে গেল! মানে, শ্রোতারা চান আরও কিছুক্ষণ ধরে বক্তব্যটা শুনতে।
 বিদ্যাসাগর বা রবীন্দ্রনাথ কিম্বা কোনও বিখ্যাত ব্যক্তিত্বকে  নিয়ে কোনও অনুষ্ঠান হওয়ার সময় দেখেছি, মঞ্চের বক্তারা এমন সব বক্তব্য দেন যেগুলো মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের থেকেও ভালো জানেন। বক্তব্যের মধ্যে কোনও নতুন তথ্য থাকে না যা শ্রোতাদের আকর্ষিত করবে। তাহলে আপনার প্রশ্ন করতে পারেন, বিদ্যাসাগর নিয়ে নতুন কী বলার থাকতে পারে? তা বলা হবে কেউ না কেউ তো তা জানতেই পারেন?— বুঝলাম, তাহলে সেক্ষেত্রে বক্তব্যটা সংক্ষিপ্ত করা হোক। ক্লাসে পড়া বলার মতো একই কথা সমস্ত অতিথিদের বলার দরকার নেই!
তাই বক্তা ও সঞ্চালকদের প্রতি কয়েকটা কথা বলতে চাই, শ্রোতাদের আমন্ত্রণ করা হয়েছে বলে কিম্বা একটি অনুষ্ঠান দেখানোর টোপ দেখিয়ে তাঁদের জোর করে বমি গেলানো উচিত নয়। মঞ্চ থেকে শ্রোতাদের শরীরি ভাষা লক্ষ্য করুন। দেখুন তারা আপনার বক্তব্য কীভাবে গ্রহণ করছেন। তাঁদের চাহিদা মতো বক্তব্য দিন।
💬কাজলকান্তি কর্মকার || রাজ্যের প্রথম শ্রেণীর একটি বাংলা দৈনিক সংবাদপত্রের সাংবাদিক
ঘাটাল || পশ্চিম মেদিনীপুর
M&W: 9933066200
eMail: ghatal1947@gmail.com


0/Post a Comment/Comments

Previous Post Next Post
close